ইরানের অর্থনীতি আরও চাপে ফেলতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট নতুন এই পদক্ষেপের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’। নতুন নিষেধাজ্ঞায় প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজকে লক্ষ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ চলাচল, স্বর্ণ, বিমান চলাচল, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সম্পদের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য—ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা প্রায় সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করে দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা। বেসেন্ট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফোন করে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে কোন কোন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বেশি চাপ দেবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। সরকারি বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে চীন, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE), তুরস্ক ও আফগানিস্তান। ইরানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ১১২টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর বড় অংশ গেছে কয়েকটি দেশেই। চীন: ১৪.৫৮ বিলিয়ন ডলার ইরানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার চীন। ইরানের তেল রপ্তানিরও সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশটি। ট্যাংকার পর্যবেক্ষণকারী বিশ্লেষকদের হিসাবে, সমুদ্রপথে ইরানের রপ্তানি করা অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনে থাকে। এসব তেলের বড় অংশ তুলনামূলক কম দামে এবং গোপন নৌবহরের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। ইরাক: ১১.৭ বিলিয়ন ডলার ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার ইরাক। ইরান ইরাকে গ্যাস সরবরাহ করে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যও রপ্তানি করে। সংযুক্ত আরব আমিরাত: ৭.১৬ বিলিয়ন ডলার দীর্ঘদিন ধরে আমিরাত ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ তুলে আবুধাবি সম্প্রতি ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তেহরান অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তুরস্ক: ৬.১ বিলিয়ন ডলার ইরান তুরস্কে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করে। পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল, খাদ্যপণ্য ও নির্মাণসামগ্রীও রপ্তানি করে। আফগানিস্তান: ২.৩ বিলিয়ন ডলার ইরানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী বাজার আফগানিস্তান। ইরান সেখানে জ্বালানি, খাদ্য ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে। সমুদ্রবন্দর ও স্থলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আফগানিস্তান ইরানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইরানের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস ২০২৪ সালে ইরান অন্তত ৮৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে প্রায় ৬৮.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। এ ক্ষেত্রেও কয়েকটি দেশ ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমিরাত: ২১ বিলিয়ন ডলার ইরানের মোট আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশের কিছু বেশি এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এর বড় অংশ সরাসরি আমিরাতে উৎপাদিত পণ্য নয়; বরং অন্য দেশ থেকে আমিরাতে আসা পণ্য পরে ইরানে পুনঃরপ্তানি করা হয়। এর মাধ্যমে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য ও ভোগ্যপণ্য পাওয়ার সুযোগ পেত। আমিরাতের নতুন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে বড় ধাক্কা দিতে পারে। চীন: ১৭.৮ বিলিয়ন ডলার ইরানের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ি ও শিল্পের বিভিন্ন উপাদানের প্রধান সরবরাহকারী চীন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য কমে যাওয়ার পর চীনের ওপর ইরানের নির্ভরতা আরও বেড়েছে। তুরস্ক: ১১.১ বিলিয়ন ডলার দুই দেশের অভিন্ন স্থলসীমান্ত ও দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তুরস্ককে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথে পরিণত করেছে। তুরস্ক থেকে ইরান যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, গাড়ি ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য আমদানি করে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর দুই দেশের বাণিজ্যই কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ৬.১ বিলিয়ন ডলার ২০১৮ সালের আগের তুলনায় ইউরোপের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য এখন অনেক কম। বর্তমানে ইউরোপ থেকে ইরানে মূলত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শিল্পযন্ত্রপাতি যায়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন চীনকে ঘিরে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে চীন। কারণ চীন একই সঙ্গে ইরানের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস। বিশেষ করে ইরানের তেল বিক্রির ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে আমিরাত ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুনঃরপ্তানি ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, আর তুরস্ক স্থলপথে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। তাই ইরানের অর্থনৈতিক ‘লাইফলাইন’ কেটে দিতে হলে শুধু তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেই হবে না—ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া চীন, আমিরাত ও তুরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে হতে পারে। তবে এসব দেশকে ইরান থেকে দূরে সরানো কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা এমএসএম

Source: Jago News 24 Bangla