কম্পিউটার বা ল্যাপটপে টাইপ করার সময় কিবোর্ডের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে একটি বিষয় অক্ষরগুলো এ, বি, সি, ডি ক্রমে সাজানো নয়। বরং কিউ, ডব্লিউ, ই, আর, টি, ওয়াই দিয়ে শুরু হয়ে পুরো কিবোর্ডজুড়ে অক্ষরগুলো যেন এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে। অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, অক্ষরগুলো যদি বর্ণমালার ক্রমেই সাজানো যেত, তাহলে তো টাইপ করা আরও সহজ হতো! আসলে এই অদ্ভুত বিন্যাসের পেছনে রয়েছে টাইপরাইটারের দীর্ঘ ইতিহাস, যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা এবং টাইপিংয়ের গতি নিয়ন্ত্রণের একটি পুরোনো ধারণা। শুরুটা হয়েছিল টাইপরাইটার দিয়ে আজকের কম্পিউটার কিবোর্ডের নকশার ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের টাইপরাইটারের যুগে। ১৮৬০-এর দশকে ক্রিস্টোফার ল্যাথাম শোলসসহ কয়েকজন উদ্ভাবক বাণিজ্যিক টাইপরাইটারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তখন টাইপরাইটারে প্রতিটি অক্ষরের জন্য আলাদা ধাতব টাইপবার বা হাতুড়ির মতো অংশ থাকত। কোনো অক্ষরের কী চাপলে সংশ্লিষ্ট টাইপবার কাগজের দিকে গিয়ে কালি লাগানো ফিতায় আঘাত করত এবং কাগজে অক্ষর ছাপত। সমস্যা ছিল, পাশাপাশি থাকা নির্দিষ্ট অক্ষরগুলো দ্রুত পরপর চাপলে টাইপবারগুলো একে অপরের সঙ্গে আটকে যেতে পারত। এই যান্ত্রিক সমস্যাই কিবোর্ডের অক্ষর বিন্যাসের ইতিহাসে বড় ভূমিকা রাখে। আরও পড়ুন স্মার্টফোন আসার আগে যে ৫ ফোনে মজেছিল দুনিয়া তাহলে কিউ, ডব্লিউ, ই, আর, টি, ওয়াই কেন? বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত কিবোর্ড বিন্যাসের নাম কিউডব্লিউইআরটিওয়াই। নামটি এসেছে কিবোর্ডের ওপরের সারির প্রথম ছয়টি অক্ষরকিউ, ডব্লিউ, ই, আর, টি, ওয়াই থেকে। তবে একটা প্রচলিত ধারণা আছে, টাইপরাইটারের অক্ষরগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে টাইপ করার গতি কমে যায়। কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কিউডব্লিউইআরটিওয়াই বিন্যাস তৈরির পেছনে টাইপরাইটারের যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল ঠিকই, কিন্তু শুধু মানুষকে ধীরে টাইপ করানোর জন্য এই বিন্যাস তৈরি হয়েছিল এমন সরল ব্যাখ্যার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। বরং বিভিন্ন সূত্র ও ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে বোঝা যায়, শোলস ও তার সহযোগীরা টাইপবারের সংঘর্ষের সমস্যা কমানো এবং ব্যবহারযোগ্য একটি বিন্যাস তৈরির জন্য অক্ষরগুলোর অবস্থান নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। বর্ণমালা অনুযায়ী সাজালে কি দ্রুত টাইপ করা যেত? প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এ থেকে জেড পর্যন্ত অক্ষর সাজিয়ে দিলেই টাইপ করা সহজ হবে। কিন্তু দ্রুত টাইপ করার ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সরল নয়। টাইপ করার সময় আমাদের দুই হাতের বিভিন্ন আঙুল দিয়ে একাধিক অক্ষর চাপতে হয়। ইংরেজি ভাষায় কিছু অক্ষর খুব বেশি ব্যবহৃত হয়, আবার কিছু অক্ষর তুলনামূলক কম ব্যবহৃত হয়। কিউডব্লিউইআরটিওয়াই বিন্যাসে অক্ষরগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে টাইপ করার সময় দুই হাতের বিভিন্ন আঙুল ব্যবহার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ কিবোর্ডের বর্তমান বিন্যাস শুধু অক্ষর মনে রাখার সুবিধার ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি; টাইপিংয়ের গতি, হাতের নড়াচড়া এবং টাইপরাইটারের যান্ত্রিক কাঠামোর বিষয়ও বিবেচনায় ছিল। আরও পড়ুন আইফোনের মতো ভালো ছবি তুলতে পারবেন সস্তার ৩ অ্যান্ড্রয়েড ফোনে কিউডব্লিউইআরটিওয়াই-ই কি একমাত্র বিন্যাস? একেবারেই নয়। কিউডব্লিউইআরটিওয়াই সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও এর বিকল্প কিবোর্ড লেআউটও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ডভোরাক সরলীকৃত কীবোর্ড। ১৯৩০-এর দশকে অগাস্ট ডভোরাক ও উইলিয়াম ডিলি এই বিন্যাস তৈরি করেন। এর লক্ষ্য ছিল বেশি ব্যবহৃত অক্ষরগুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে আঙুলের চলাচল কমে এবং টাইপিং আরও দক্ষ হয়। আরেকটি জনপ্রিয় বিকল্প হলো কোলেমাক। এটি আধুনিক কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য কিউডব্লিউইআরটিওয়াই-এর বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। তবে নতুন লেআউটে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য সময় লাগে। ফলে কিউডব্লিউইআরটিওয়াই এত পুরোনো ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ সেটিই ব্যবহার করে চলেছেন। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে বদলানো কঠিন কিউডব্লিউইআরটিওয়াই কিবোর্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর ঐতিহাসিক জনপ্রিয়তা। টাইপরাইটার থেকে কম্পিউটার, তারপর ল্যাপটপ ও স্মার্টফোনের ভার্চুয়াল কিবোর্ড প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু কিউডব্লিউইআরটিওয়াই বিন্যাসের মূল কাঠামো থেকে গেছে। এর পেছনে রয়েছে অভ্যাস ও সামঞ্জস্যের বিষয়টি। কোটি কোটি মানুষ কিউডব্লিউইআরটিওয়াই শিখেছেন। স্কুল, অফিস, সফটওয়্যার, কিবোর্ড প্রস্তুতকারক সব জায়গায় এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে নতুন কোনো বিন্যাস প্রযুক্তিগতভাবে কিছু সুবিধা দিলেও সবাইকে নতুন করে শেখানো এবং পুরো ব্যবস্থাকে বদলে ফেলা সহজ নয়। এটিকে অর্থনীতির ভাষায় ‘নেটওয়ার্ক ইফেক্ট’ হিসেবেও দেখা যায়। যত বেশি মানুষ একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করেন, সেটিই তত বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। স্মার্টফোনেও কেন একই বিন্যাস? আজকের স্মার্টফোনে তো আর ধাতব টাইপবার নেই। তাহলে সেখানেও কেন কিউডব্লিউইআরটিওয়াই? কারণ, স্মার্টফোনের কিবোর্ড মূলত মানুষের পরিচিত টাইপিং অভ্যাসকে অনুসরণ করে। কম্পিউটার বা ফিজিক্যাল কিবোর্ডে কিউডব্লিউইআরটিওয়াই শেখা মানুষ যেন ফোনেও সহজে টাইপ করতে পারেন, সেজন্য ভার্চুয়াল কিবোর্ডেও একই বিন্যাস রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আজকের টাচস্ক্রিনে কিউডব্লিউইআরটিওয়াই থাকার পেছনে আর টাইপবার আটকে যাওয়ার ভয় নেই; বরং পুরোনো একটি নকশার সঙ্গে মানুষের অভ্যাস ও প্রযুক্তির সামঞ্জস্যই এখানে মূল বিষয়। এলোমেলো নয়, ইতিহাসের ফল তাই কিবোর্ডের অক্ষরগুলো আসলে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে দেওয়া নয়। প্রতিটি অবস্থানের পেছনে রয়েছে টাইপরাইটারের যুগের প্রযুক্তিগত ইতিহাস এবং পরবর্তী সময়ে মানুষের তৈরি অভ্যাস। আজ আমরা যে কিউডব্লিউইআরটিওয়াই কিবোর্ডে অনায়াসে টাইপ করি, সেটি তৈরি হয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। মজার বিষয় হলো, যে যান্ত্রিক সমস্যার যুগ থেকে এই বিন্যাসের যাত্রা শুরু, আধুনিক কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে সেই সমস্যাই আর নেই। তবু কিউডব্লিউইআরটিওয়াই টিকে আছে কারণ প্রযুক্তির চেয়ে অনেক সময় মানুষের অভ্যাসই কোনো নকশাকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখে। কেএসকে
Source: Jago News 24 Bangla

