ADHD মোকাবিলা-বাবা-মা ও শিশুদের জন্য সহায়তা

শিশুদের অনেক সময় মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয় অথবা তারা অতিরিক্ত চঞ্চল থাকে। কিন্তু এসব সমস্যা যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং স্কুল, বাড়ি বা অন্যান্য একাধিক পরিবেশে শিশুর দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করে, তাহলে এগুলো অ্যাটেনশন-ডেফিসিট/হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (Attention-Deficit/Hyperactivity Disorder বা ADHD)-এর লক্ষণ হতে পারে।

ADHD-এর কারণে শিশুর শেখা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। গবেষকেরা ADHD-তে আক্রান্ত শিশু এবং তাদের বাবা-মাকে এমন দক্ষতা শেখানোর নতুন উপায় খুঁজছেন, যা তাদের লক্ষণগুলো আরও ভালোভাবে সামলাতে সাহায্য করতে পারে।

ADHD-এর লক্ষণ কী হতে পারে?

ADHD-তে আক্রান্ত কিছু শিশুর প্রধান সমস্যা হলো মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা। ফলে তাদের কোনো কাজ শেষ করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠে মনোযোগ দেওয়া অথবা কারও সঙ্গে কথোপকথনের সময় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

অন্য কিছু শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত চঞ্চলতা (Hyperactivity) অথবা হঠাৎ চিন্তা না করে কাজ করার প্রবণতা (Impulsivity) দেখা যায়। তারা অনেক বেশি নড়াচড়া করতে পারে এবং অতিরিক্ত কথা বলতে পারে।

আবার কিছু শিশুর মধ্যে উভয় ধরনের লক্ষণই দেখা যায়।

এসব লক্ষণ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও থেকে যেতে পারে।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ড. লরেন ফ্রিডম্যান বলেন, “ADHD সারা জীবন ধরে থাকতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর প্রকাশ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।”

উদাহরণস্বরূপ, ADHD-তে আক্রান্ত একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো মিটিংয়ে বসে প্রচণ্ড অস্থিরতা অনুভব করতে পারেন, যদিও তিনি শিশুর মতো বারবার নিজের আসন ছেড়ে উঠে নাও যেতে পারেন।

ADHD শনাক্ত করা সব সময় সহজ নয়

ADHD নির্ণয় করা কিছু ক্ষেত্রে কঠিন হতে পারে। কারণ অন্য কিছু সমস্যার লক্ষণও ADHD-এর মতো মনে হতে পারে।

ড. ফ্রিডম্যান বলেন, “কেউ উদ্বেগে ভুগলে তার মাথায় বিভিন্ন দুশ্চিন্তার চিন্তা আসতে পারে, যা তাকে মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।”

একইভাবে বিষণ্নতা বা শেখার সমস্যার (Learning Disability) কারণেও মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হতে পারে।

তাই ADHD সন্দেহ হলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

চিকিৎসকের শারীরিক ও চিকিৎসাগত মূল্যায়ন একই ধরনের লক্ষণের অন্য সম্ভাব্য কারণগুলো শনাক্ত বা বাদ দিতে সাহায্য করতে পারে।

তবে ADHD নির্ণয় একটি প্রক্রিয়া। এর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। পরিবারের সদস্য এবং শিক্ষকদের কাছ থেকেও শিশুর আচরণ সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হতে পারে।

ADHD নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লক্ষণগুলো দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে হবে এবং একাধিক পরিবেশে দেখা দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু স্কুলে অথবা শুধু বাড়িতে সমস্যা হলেই সেটিকে ADHD বলা যায় না।

ADHD-এর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা

ADHD-এর চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, থেরাপি অথবা উভয়ের সমন্বয় ব্যবহার করা হতে পারে।

কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ওষুধ দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করা আচরণগুলো নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তবে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণে ওষুধ ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

থেরাপির মাধ্যমে শিশুকে তার লক্ষণ সামলানোর বিভিন্ন দক্ষতা শেখানো হয়। একই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবন সহজ করার জন্য নিয়মিত রুটিন তৈরি করতেও সাহায্য করা হয়।

বাবা-মায়ের প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ

ADHD-তে আক্রান্ত শিশুর বাবা-মা আচরণ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ (Behavior Management Training) নিতে পারেন।

এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাবা-মা শেখেন কীভাবে সন্তানের আচরণ বুঝবেন, ইতিবাচক আচরণকে উৎসাহিত করবেন এবং দৈনন্দিন কাজগুলো আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে সন্তানকে সাহায্য করবেন।

জিনগত কারণ ADHD-তে ভূমিকা রাখে। তাই অনেক পরিবারে বাবা বা মায়ের পাশাপাশি সন্তানের মধ্যেও ADHD থাকতে পারে।

বাবা-মায়ের নিজের ADHD-এর লক্ষণ থাকলে সন্তানকে সাহায্য করার জন্য আচরণ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণে শেখা কৌশলগুলো নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

ড. ফ্রিডম্যান এমন পরিবারগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কীভাবে সহায়তা করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছেন।

বাবা-মাকেও নিজের ADHD সামলাতে সাহায্য করা

ড. ফ্রিডম্যানের গবেষণায় ADHD থাকা বাবা-মায়েরা সাধারণ আচরণ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সন্তানকে কীভাবে সহায়তা করবেন তা শেখেন।

এর পাশাপাশি তারা নিজেদের ADHD-এর লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও বিভিন্ন দক্ষতা শেখেন।

ড. ফ্রিডম্যান বলেন, “আমরা বাবা-মাকে কাজ গুছিয়ে করা এবং সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা শেখাই। এর ফলে তারা সন্তানের জন্য শেখা কৌশলগুলো আরও কার্যকর ও ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন।”

উদাহরণস্বরূপ, বাবা-মাকে শেখানো হতে পারে—

  • গুরুত্বপূর্ণ কাজের তালিকা তৈরি করা;
  • নির্দিষ্ট দৈনিক রুটিন অনুসরণ করা;
  • সময় ভাগ করে কাজ করা;
  • সন্তানের জন্য নির্ধারিত নিয়ম ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা;
  • গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা নিয়ম মনে রাখার জন্য রিমাইন্ডার ব্যবহার করা।

প্রযুক্তিও সাহায্য করতে পারে

ড. ফ্রিডম্যানের গবেষণায় একটি স্মার্টফোন অ্যাপের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। অ্যাপটি বাবা-মাকে প্রশিক্ষণে শেখা কৌশলগুলো ব্যবহার করার কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিভেদে আলাদা সময়ে রিমাইন্ডার পাঠানো যায়।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো পরিবারের সকালবেলার সময়টি যদি খুব ব্যস্ত থাকে এবং বাবা-মা সেই সময়ে শেখা কৌশলগুলো ব্যবহার করতে ভুলে যান, তাহলে অ্যাপটি সকালে তাদের রিমাইন্ডার পাঠাতে পারে।

সঠিক সহায়তায় ADHD সামলানো সম্ভব

সঠিক সহায়তা পেলে ADHD-তে আক্রান্ত শিশুরা তাদের লক্ষণ আরও ভালোভাবে সামলাতে শিখতে পারে এবং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

বাবা-মা সন্তানের জন্য একটি নিয়মিত ও সহজ দৈনিক রুটিন তৈরি করতে পারেন। বড় কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে দিতে পারেন এবং নির্দেশনা সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার রাখতে পারেন।

শিশু ভালোভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করলে বা ইতিবাচক আচরণ করলে তার প্রশংসা করুন। পড়াশোনার সময় অপ্রয়োজনীয় শব্দ, মোবাইল বা অন্য মনোযোগ-বিভ্রান্তকারী বিষয় কমিয়ে একটি শান্ত পরিবেশ তৈরি করাও উপকারী হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ADHD-তে আক্রান্ত শিশুকে শুধু “দুষ্ট”, “অলস” বা “অমনোযোগী” হিসেবে বিবেচনা না করে তার সমস্যাটি বোঝা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।

পরিবার, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে কাজ করলে শিশুর জন্য তার লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা, শেখার দক্ষতা বাড়ানো এবং নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হতে পারে।