দুপুরে কিংবা রাতে খেতে বসেছেন, একা কিংবা পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে এটা খুব সুন্দর এবং প্রতিদিনকার দৃশ্য। কিন্তু এখন একটি নতুন দৃশ্য দেখা যায়, ছোট-বড় সবাই খেতে বসলেই ফোনে গোপাল ভাঁড় দেখতে শুরু করছেন। ভাত খেতে বসেছেন, সামনে গরম ভাতের প্লেট। সঙ্গে তরকারি, ডাল কিংবা মাছ। কিন্তু খাওয়ার আগে যেন আরেকটি জিনিস না হলে চলছেই না মোবাইল ফোন। ফোনে ইউটিউব খুলে ‘গোপাল ভাঁড়’-এর একটি পর্ব চালিয়ে না দিলে অনেকেরই যেন খাওয়াটা ঠিক জমছে না। শুধু শিশু-কিশোর নয়, বড়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে একই অভ্যাস। দুপুরের খাবার হোক কিংবা রাতের খাবার, প্লেট সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকের হাতে চলে যাচ্ছে ফোন, আর পর্দায় শুরু হচ্ছে গোপাল ভাঁড়ের কাণ্ডকারখানা। বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের কমেন্ট বক্সেও এর ছাপ দেখা যায়। বিভিন্ন ভিডিওর নিচে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের মন্তব্যে বোঝা যায়, বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বিদেশে থাকা অনেক বাঙালিও খাওয়ার সময় এই কার্টুন দেখেন। কেউ দুপুরের খাবারের সময়, কেউ আবার রাতের খাবারের সঙ্গে গোপালের গল্পকে সঙ্গী করছেন। অর্থাৎ এটি শুধু একটি কার্টুন দেখার অভ্যাস নয়, অনেকের দৈনন্দিন খাওয়ার রুটিনের অংশ হয়ে উঠেছে। আরও পড়ুন ব্রিটিশদের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হোয়াইট হাউজ: ফিনিক্স পাখি হয়ে ফিরলো হঠাৎ কেন গোপাল ভাঁড় এত জনপ্রিয়? ‘হঠাৎ’ শব্দটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গোপাল ভাঁড়ের গল্প বাঙালির কাছে নতুন নয়। কিন্তু পুরোনো এই চরিত্রকে ঘিরে তৈরি অ্যানিমেশন সিরিজটি নতুন প্রজন্মের কাছে এমনভাবে পৌঁছেছে, যা আগের প্রজন্মের বই বা মুখে মুখে প্রচলিত গল্পের পক্ষে সম্ভব ছিল না। বর্তমান সময়ে ইউটিউবের কারণে বিনোদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করতে হয় না। টেলিভিশনে কার্টুনের নির্দিষ্ট সম্প্রচারের সময়ের বদলে এখন দর্শক নিজের সুবিধামতো পর্ব চালাতে পারেন। খাওয়ার সময় মোবাইলে কয়েকটি ক্লিকেই পাওয়া যাচ্ছে গোপাল ভাঁড়ের একের পর এক গল্প। একটি পর্ব শেষ হলে একই ধরনের আরও পর্ব সামনে চলে আসছে। ফলে খাবারের সময় কয়েক মিনিটের বিনোদন খুব সহজেই নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। আর গোপাল ভাঁড়ের গল্পের ধরনও এই অভ্যাস তৈরিতে সাহায্য করছে। অধিকাংশ গল্পের কেন্দ্রেই থাকে হাস্যরস, বুদ্ধির খেলা, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে গোপালের কথোপকথন এবং শেষ মুহূর্তে গোপালের চমকপ্রদ সমাধান। গল্পগুলো সাধারণত সহজে বোঝা যায় এবং একটি পর্ব দেখতে আলাদা করে বেশি মনোযোগ বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না। তাই খাবারের সঙ্গে হালকা বিনোদন হিসেবে এটি বেশ উপযোগী। গোপাল ভাঁড় আসলে কে? গোপাল ভাঁড়ের শিকড় রয়েছে বাংলার লোককথায়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তিনি ছিলেন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারের রসিক ও বুদ্ধিমান সভাসদ। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, উপস্থিত বুদ্ধি এবং হাস্যরসের গল্প বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে মুখে মুখে প্রচলিত। প্রচলিত বর্ণনায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে গোপালের বিশেষ মর্যাদা ছিল এবং তাঁকে নবরত্নদের একজন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। আরও পড়ুন আগস্টেই ৬ মিনিট অন্ধকারে ডুবে থাকবে পৃথিবী, কী করবেন তখন? তবে গোপাল ভাঁড় ঐতিহাসিকভাবে ঠিক কতটা বাস্তব চরিত্র ছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার জীবনের নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য খুব সীমিত। গবেষণা ও লোকসাহিত্যে তাঁর পরিচয় মূলত কিংবদন্তি ও প্রচলিত গল্পের সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে আজকের গোপাল ভাঁড় একদিকে লোকসংস্কৃতির চরিত্র, অন্যদিকে বাঙালির হাস্যরসের দীর্ঘ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গল্প থেকে অ্যানিমেশন গোপাল ভাঁড়ের গল্প বহু বছর ধরেই বই, পত্রিকা, নাটক ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু অ্যানিমেশন সিরিজ তাঁকে শিশুদের কাছে নতুনভাবে পরিচিত করে। সনি আট নামের ভারতের এক টিভি চ্যানেলে ‘গোপাল ভাঁড়’ অ্যানিমেশন সিরিজের যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে। এরপর টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এর পর্ব ছড়িয়ে পড়ে। সিরিজটির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে সেই পরিচিত গোপাল যিনি নিজের বুদ্ধি ও রসবোধ দিয়ে রাজদরবারের নানা সমস্যার সমাধান করেন। এর ফলে একই চরিত্রকে একসঙ্গে দুই প্রজন্ম চিনতে শুরু করে। বাবা-মা বা দাদা-দাদির কাছে গোপাল ভাঁড় যেখানে ছোটবেলার গল্পের চরিত্র, শিশুদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন রঙিন অ্যানিমেশনের মজার মানুষ। গোপাল ভাঁড় শুধু শিশুদের কার্টুন নয় গোপাল ভাঁড়ের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই এটি কেবল শিশুদের জন্য আটকে নেই। ছোটরা হাসে গোপালের মজার কাণ্ড দেখে, আর বড়রা অনেক সময় গল্পের ব্যঙ্গ, বুদ্ধির খেলা কিংবা পুরোনো বাংলার আবহ উপভোগ করেন। ফলে পরিবারের একাধিক বয়সের মানুষ একই কনটেন্ট দেখতে পারেন। ২০২৬ সালে গোপাল ভাঁড়কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা ও ভাইরাল কনটেন্টও তৈরি হয়েছে। কার্টুনটি শেষ হয়ে যাচ্ছে এমন গুজব নিয়েও আলোচনা হয়েছিল, যদিও পুরোনো একটি পর্বের দৃশ্যকে ঘিরে তৈরি সেই দাবি বিভ্রান্তিকর ছিল এবং নতুন পর্ব সম্প্রচারের তথ্যও সামনে এসেছে। এই নতুন আলোচনা চরিত্রটির প্রতি দর্শকদের আগ্রহ আবারও সামনে এনেছে। তাই খেতে বসে গোপাল ভাঁড় দেখা আসলে একদিনে তৈরি কোনো নিয়ম নয়। পুরোনো লোককথার পরিচিত চরিত্র, সহজ-সরল হাসির গল্প, অ্যানিমেশনের আকর্ষণ এবং ইউটিউবের সহজলভ্যতা সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই অভ্যাস। আর বাঙালির কাছে খাবারের সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক তো নতুন নয়। শুধু গল্প বলার মানুষটির জায়গায় এখন বসেছে মোবাইলের পর্দা, আর সেই পর্দায় হাসতে হাসতে ভাত খাওয়ার সঙ্গী হয়ে উঠেছেন গোপাল ভাঁড়। কেএসকে
Source: Jago News 24 Bangla

