সব শিশুই সময়ে সময়ে মানসিক চাপ অনুভব করে। তারা বন্ধু-বান্ধব, বাড়ির কাজ বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। এ ধরনের চাপ স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু শিশু অত্যন্ত চাপপূর্ণ বা মানসিকভাবে আঘাতমূলক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা শৈশবের কঠিন অভিজ্ঞতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। একই সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতার ক্ষতিকর স্বাস্থ্যপ্রভাব থেকে শিশুদের কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই উপায়ও খুঁজছেন।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নিম টটেনহ্যাম বলেন, “আমরা নিয়মিত জীবনে যে স্বাভাবিক চাপ বা চাপপূর্ণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, সেগুলো সাধারণত এমন হয় যা একজন মানুষ যুক্তিসংগতভাবে সামলাতে পারে। শিশুর ক্ষেত্রে একজন সহায়ক ও যত্নশীল অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীর সাহায্যে সে এই চাপ মোকাবিলা করতে পারে।”
শিশুর বিকাশবিষয়ক NIH বিশেষজ্ঞ ড. জিং ইউ বলেন, “জীবনে বৃদ্ধি ও শেখার জন্য স্বাভাবিক মাত্রার চাপ গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক চাপের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে মানিয়ে নিতে পারলে শিশুর কর্মদক্ষতা ও বিভিন্ন দক্ষতার বিকাশ ঘটতে পারে।”
কিন্তু মানসিক চাপ যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে অথবা কোনো গুরুতর মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্টি হয়, তাহলে তা বিষাক্ত বা ক্ষতিকর মানসিক চাপে (Toxic Stress) পরিণত হতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এর উদাহরণ হতে পারে শারীরিক, যৌন বা মানসিক নির্যাতন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব ও সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠাও এর কারণ হতে পারে। গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা মাদকাসক্তিতে ভোগা মানুষের সঙ্গে বসবাস, এলাকার সহিংসতা, বৈষম্য এবং চরম দারিদ্র্যও শিশুর ওপর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এসব পরিস্থিতি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে তাদের পড়াশোনা এবং সামাজিক জীবনেও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
ড. ইউ বলেন, “শিশুরা তখনও মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা তৈরি করছে। এই সময়ে তারা যদি অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, তাহলে চাপের প্রতি যথাযথভাবে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”
তবে শৈশবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া সব শিশুরই পরবর্তী জীবনে স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয় না। ইতিবাচক জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সুন্দর সম্পর্কও একটি শিশুর ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
নিরাপদ, স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক শিশুদের কঠিন ও চাপপূর্ণ পরিস্থিতির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
মানসিক চাপ ও প্রতিকূল অভিজ্ঞতা
অনেক মানুষ শৈশবে অত্যন্ত চাপপূর্ণ বা মানসিকভাবে আঘাতমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এগুলোকে বলা হয় প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতা (Adverse Childhood Experiences বা ACEs)।
গবেষণায় অনুমান করা হয়, প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে প্রায় দুজন শৈশবে অন্তত একটি এমন প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। আর প্রতি ছয়জনের মধ্যে প্রায় একজন চারটি বা তার বেশি প্রতিকূল অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
যেসব শিশু চারটি বা তার বেশি প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। এর মধ্যে রয়েছে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং স্ট্রোক।
একই সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং মাদক বা অন্যান্য পদার্থ ব্যবহারের সমস্যার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।
ড. ইউ ব্যাখ্যা করেন, “প্রতিকূলতা বলতে এমন কিছুর উপস্থিতি বোঝাতে পারে যা থাকা উচিত নয়—যেমন নির্যাতন। আবার এমন ভালো কিছুর অনুপস্থিতিও প্রতিকূলতা হতে পারে যা একটি শিশুর জীবনে থাকা উচিত—যেমন বাবা-মায়ের যত্ন ও ভালোবাসা।”
তিনি আরও বলেন, শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য চিন্তা ও শেখার উপযোগী উদ্দীপনা এবং পর্যাপ্ত আবেগীয় মনোযোগ প্রয়োজন।
আগে বিজ্ঞানীরা প্রধানত একটি শিশু কতগুলো প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে, সেটির সংখ্যা বিবেচনা করতেন। বর্তমানে গবেষকেরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল অভিজ্ঞতার প্রভাব আলাদাভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।
উদাহরণস্বরূপ, কিছু প্রতিকূল অভিজ্ঞতা মূলত শিশুর চিন্তাভাবনা ও শেখার ক্ষমতার বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা তার আবেগীয় বা সামাজিক বিকাশকে বেশি প্রভাবিত করতে পারে।
ড. ইউ-এর গবেষক দল সম্প্রতি ৪৯,০০০-এর বেশি শিশুর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। শিশুরা কী ধরনের প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে তা তারা পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর সাত বছর বয়সে শিশুদের চিন্তা, শেখা ও বোঝার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।
তাদের প্রতিকূল অভিজ্ঞতাগুলোকে ছয়টি পৃথক ধরনে ভাগ করা সম্ভব হয়েছিল।
উদাহরণস্বরূপ, কিছু শিশু শুধু পারিবারিক অস্থিতিশীলতার অভিজ্ঞতা পেয়েছিল। এর অর্থ তাদের পারিবারিক কাঠামোতে দুই বা তার বেশি পরিবর্তন ঘটেছিল। অন্য কিছু শিশু একই সঙ্গে পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, পরিবারের সদস্য হারানো এবং দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
প্রতিকূল অভিজ্ঞতার প্রতিটি ভিন্ন সমন্বয় শিশুদের মস্তিষ্ককে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে।
তবে জীবনের কোনো একটি ঘটনার প্রতি সব শিশু একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় না।
ড. ইউ বলেন, “একটি শিশু ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে এবং তার মস্তিষ্ক সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে—তার ওপর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।”
অন্যান্য গবেষকেরা প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার ইতিবাচক ফলাফল নিয়েও গবেষণা করছেন।
ড. টটেনহ্যাম বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। শৈশবের প্রতিকূলতার ফলাফল সব সময় একরকম হয় না। বিকাশমান মস্তিষ্ক তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো শিশু এমন পরিবেশে বসবাস করতে পারে যেখানে পরিস্থিতি অনিশ্চিতভাবে বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা কখনো কখনো শিশুর মধ্যে দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং এক কাজ থেকে অন্য কাজে দ্রুত পরিবর্তন করার দক্ষতা বাড়াতে পারে।
কঠিন পরিস্থিতিতে শিশুর প্রতিক্রিয়ায় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করে তা হলো ভালো সহায়তা ব্যবস্থা বা Support System।
ড. টটেনহ্যামের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে বাবা-মা বা পরিচর্যাকারীর সঙ্গে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক শিশুদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
সুরক্ষামূলক ও সহায়ক সম্পর্ক
NYU Grossman School of Medicine-এর শিশু বিকাশ গবেষক ড. ক্যাটলিন ক্যানফিল্ড বলেন, “শৈশবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হলো এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক থাকা, যিনি সত্যিকার অর্থে শিশুটির যত্ন নেন।”
তিনি বলেন, এমন একজন মানুষ দরকার যিনি শিশুকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করবেন—এমনকি দৈনন্দিন জীবনেও পাশে থাকবেন।
এই ব্যক্তি বাবা বা মা হতে পারেন। আবার একজন শিক্ষক, প্রশিক্ষক বা শিশুর জীবনে থাকা অন্য কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্কও হতে পারেন।
শিশুকে স্বাস্থ্যকর উপায়ে সমস্যা ও মানসিক চাপ মোকাবিলা করে দেখাতে এবং সেই দক্ষতা শেখাতে পারেন—এমন প্রাপ্তবয়স্কদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. ক্যানফিল্ডের দল শিশু চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে কাজ করে বাবা-মায়ের জন্য শিক্ষামূলক কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করছে।
তারা PlayReadVIP নামের একটি কর্মসূচি পরীক্ষা করছেন। এতে বাবা-মা সন্তানদের সঙ্গে খেলছেন ও বই পড়ছেন—এমন ভিডিও ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে বাবা-মায়ের ইতিবাচক দিকগুলো আরও শক্তিশালী করা এবং সন্তান লালন-পালনের লক্ষ্য নির্ধারণে সাহায্য করা হয়।
তাদের দল Smart Beginnings নামের আরেকটি কর্মসূচিও পরীক্ষা করছে। এই কর্মসূচিতে PlayReadVIP-এর সঙ্গে Family Check Up নামের আরেকটি কার্যক্রম যুক্ত করা হয়েছে।
Family Check Up কর্মসূচিতে পরিবারের বাড়িতে গিয়ে বিভিন্ন দক্ষতা তৈরিতে সাহায্য করা হয়, যাতে শিশুরা স্কুলের জন্য প্রস্তুত হতে এবং পড়াশোনায় ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
এসব বাড়ি পরিদর্শনের আরেকটি লক্ষ্য হলো পরিবারের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সাহায্য করা। যেমন—পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা অথবা বাবা-মায়ের বিষণ্নতা কমাতে সহায়তা করা।
ড. ক্যানফিল্ড বলেন, “বাবা-মা যদি বিষণ্নতায় ভোগেন, তাহলে তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক কাজ করতে নাও পারেন। এটি তাদের কাঙ্ক্ষিত উপায়ে সন্তান লালন-পালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, সামাজিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাবা-মাকে বিষণ্নতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে তাদের সন্তান লালন-পালনের পদ্ধতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সন্তানের জীবনেও ভালো প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবার ও সমাজের সহায়তা
ড. ক্যানফিল্ড পরিবারগুলোকে স্থানীয় কমিউনিটির বিভিন্ন সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করার উপায় নিয়েও গবেষণা করছেন।
তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি যে বাবা-মায়ের জন্য সামাজিক সহায়তা শিশুদের মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।”
বাবা-মায়ের মনে হওয়া দরকার যে তাদের বসবাসের এলাকা নিরাপদ এবং সেখানে তাদের একটি সামাজিক যোগাযোগ ও সহায়তার নেটওয়ার্ক রয়েছে।
তাহলে আর্থিক সমস্যা বা অন্য কোনো চাপের মুখোমুখি হলেও তারা সেই চাপের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সন্তানকে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে রক্ষা করতে পারবেন।
শিশুর মানসিক সহনশীলতা গড়ে তোলা
শিশুদের কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং তা অতিক্রম করার স্বাভাবিক ক্ষমতা রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্করা সেই ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারেন।
ড. ইউ বলেন, “সহায়ক সামাজিক সম্পর্ক এবং জীবনের অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা শিশুদের কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং মানসিক সহনশীলতা বা Resilience গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এটি শৈশবের প্রতিকূল অভিজ্ঞতার ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্য করে।”
সন্তানের জীবনে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। শিশুকে সময় দেওয়া, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার অনুভূতি দেওয়া, একসঙ্গে খেলাধুলা ও বই পড়া এবং সমস্যার সময় পাশে থাকা তার মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি শিশুর জীবনে নিরাপদ পরিবেশ, ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক এবং বিশ্বাসযোগ্য একজন প্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতি তার ভবিষ্যৎ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।

