একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শুধু সামাজিক বন্ধনই শক্ত করে না, এটি বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে এবং ডিমেনশিয়া থেকে মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করতে পারে। এমনকি খাবার থেকে আনন্দ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘ জীবনযাপনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। এটি কোনো নতুন ডায়েট নয়। বরং মানবজাতির প্রাচীন একটি অভ্যাস—অন্যদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়া, যাকে ইংরেজিতে ‘কমেনসালিটি’ (Commensality) বলা হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও আচরণবিজ্ঞানের অধ্যাপক জান-এমানুয়েল দে নেভে বলেন, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়া মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি, বিশ্বাস গড়ে তোলা এবং সামাজিক বন্ধন শক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর। তবে আধুনিক জীবনে মানুষ ক্রমেই একা হয়ে পড়ায় একসঙ্গে খাওয়ার এই অভ্যাসও কমে যাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব একসঙ্গে খাওয়ার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। চীনের ঝেজিয়াং প্রাদেশিক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের গবেষক জিনই ওয়াং ও তার সহকর্মীরা ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৯ হাজার ৩৬১ জন নারীর ওপর গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, খাবারের সময় টেবিলে কতজন মানুষ একসঙ্গে বসছেন, তার সঙ্গে বিষণ্নতার ঝুঁকির স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা কিংবা তারা একা থাকেন কি না—এসব বিষয় হিসাব করার পরও একই ফল পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, এর অর্থ হলো—অন্যদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আলাদা প্রভাব ফেলে। টোকিওর গবেষকরাও একই ধরনের ফল পেয়েছেন। ৬৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সী এমন মানুষ, যারা পরিবারের সঙ্গে থাকেন কিন্তু একা খাবার খান, নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে খাবার খান এমন মানুষের তুলনায় বিষণ্নতার উপসর্গে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। একসঙ্গে খেলে বাড়ে সুখ এ বিষয়ে সবচেয়ে বড় প্রমাণগুলোর একটি পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বের প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের খাবারের অভ্যাস নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, মানুষ যত বেশি অন্যদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খান, তাদের মানসিক সুস্থতার মাত্রাও তত বেশি হয়। দে নেভের দলের মতে, অন্যদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস একজন মানুষের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে চাকরি ও আপেক্ষিক আয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। খাবার আরও আনন্দদায়ক করে একসঙ্গে খাওয়ার সময় শুধু সামাজিক সম্পর্কই শক্ত হয় না, খাবারের স্বাদ ও আনন্দও বাড়তে পারে। অক্সফোর্ডের জীববিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক রবিন ডানবারের মতে, খাবার খাওয়ার সময় শরীরে স্বাভাবিকভাবে এন্ডোরফিন নিঃসরণ হতে পারে। এসব রাসায়নিক উপাদান আনন্দ ও ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে এবং খাবারের সঙ্গে থাকা মানুষের বন্ধন আরও শক্ত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এরিকা বুথবির একাধিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, অন্য কারও সঙ্গে বসে চকোলেট খেলে মানুষ সেটিকে আরও সুস্বাদু বলে মনে করেন। ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকেও ধীর করতে পারে। ২০২৫ সালে জাপানের গবেষকেরা দেখতে পান, যারা নিয়মিত একা খাবার খান, তাদের মস্তিষ্কের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের আয়তন তুলনামূলক কম। এসব অংশের মধ্যে রয়েছে হিপোক্যাম্পাস ও মস্তিষ্কের মধ্যবর্তী টেম্পোরাল লোব, যা স্মৃতি ও অন্যান্য জ্ঞানীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। একাকী খাওয়ার সঙ্গে কম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সম্পর্কও রয়েছে। তবে শুধু খাদ্যাভ্যাস দিয়ে মস্তিষ্কের এই পার্থক্য পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। গবেষকদের ধারণা, সামাজিক যোগাযোগের অভাবও দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একসঙ্গে খাওয়ার সময় কথাবার্তা ও সামাজিক যোগাযোগ মানসিক চাপ কমাতে পারে। পাশাপাশি আলোচনা ও কথোপকথন মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার জন্য অতিরিক্ত মানসিক উদ্দীপনাও দিতে পারে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের তখন স্বাভাবিক জ্ঞানীয় সক্ষমতা ছিল। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের মস্তিষ্কের পরিবর্তন ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একসঙ্গে খাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে ইতালি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার অভ্যাসে বড় পার্থক্য রয়েছে। জাপানে মানুষ গড়ে সপ্তাহে চারটিরও কম খাবার একসঙ্গে খান। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা প্রায় সাত থেকে আটটি, আর ইতালিতে তা প্রায় নয়টি। ইতালির খাবারের সংস্কৃতিতে সামাজিকভাবে একসঙ্গে খাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইউনেসকো ইতালীয় খাবারকে ‘অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরিতে খাবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরে। ইতালিতেই আধুনিক জীবনের চাপে এই সংস্কৃতি ধরে রাখার নানা উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দেশটিতে শুরু হওয়া স্লো ফুড আন্দোলন ৫০ বছর আগে ফাস্টফুডের জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে যাত্রা শুরু করে। স্থানীয় খাদ্য ঐতিহ্য রক্ষা ও টেকসই খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি এই আন্দোলন নিয়মিত একসঙ্গে খাবার খাওয়ার গুরুত্বও তুলে ধরে। স্লো ফুড ইতালিয়ার সভাপতি বারবারা নাপ্পিনি বলেন, ইতালিতে খাবার ভাগ করে খাওয়াকে একটি দর্শন হিসেবেই দেখা হয়—একসঙ্গে রান্না করা এবং খাবার তৈরির কাজ ভাগ করে নেওয়া। এর জন্য প্রয়োজন যত্ন ও ধৈর্য। বন্ধু বানানোর সহজ উপায় হতে পারে একসঙ্গে খাওয়া আধুনিক জীবনে একাকিত্ব বাড়লেও অন্যদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়তো খুব কঠিন নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা প্রায়ই মনে করি অন্যরা আমাদের সঙ্গে সময় কাটাতে আগ্রহী নয়। কিন্তু বাস্তবে মানুষ সাধারণত বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতদের কাছ থেকে একসঙ্গে খাবারের আমন্ত্রণ পেলে যতটা ইতিবাচকভাবে সাড়া দেয়, আমরা তা অনুমান করি না। তাই পরিচিত কারও একাকিত্বের কথা মনে হলে তাকে একসঙ্গে খাবারের আমন্ত্রণ জানানোই হতে পারে সহজ সমাধান। এমনকি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরির জন্য প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে ইতালির প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পাওলো বারাভারো Tablo নামে একটি অ্যাপ চালু করেন। এর মাধ্যমে একাকী মানুষদের একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। এখন পর্যন্ত অ্যাপটি ৩ লাখের বেশি বার ব্যবহার করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানী জামিল জাকির স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু লাজুক শিক্ষার্থীর জন্য ‘প্লেটোনিক ডেট’-এর ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে তারা ক্যাম্পাসের একটি কফিশপে একে অপরের সঙ্গে দেখা করতেন। এতে তাদের সামাজিক আত্মবিশ্বাস বাড়তে সাহায্য করেছিল। অর্থাৎ, একসঙ্গে খাবার খাওয়া শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়—এটি বন্ধুত্ব তৈরি, মানসিক সুস্থতা বাড়ানো এবং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখারও একটি সহজ উপায় হতে পারে। সূত্র: বিবিসি এমএসএম
Source: Jago News 24 Bangla

