অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের ঘটনার পর হযরত ইবরাহিম (আ.) বর্তমান ইরাকের উর অঞ্চল থেকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন হয়ে মিশরে সফর করেন। মূলত হিজরতের জন্য উপযুক্ত জনপদ খুঁজতে আল্লাহর হুকুমেই তিনি এই দীর্ঘ সফর করেন। এই সফরের একেবারে শুরুর দিকে তিনি ‘হারান’ নামক একটি রাজ্য অতিক্রম করছিলেন। তিনি জানতে পারলেন সেখানকার রাজকুমারী সারা সবার থেকে একদমই আলাদা। সারা শুধু রূপেই নয়, গুণেও ছিলেন অনন্যা। তিনি সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সাথে একমত হতে পারতেন না, তার কাছে মনে হতো এই প্রাণহীন মূর্তি কীভাবে কারও উপাস্য হতে পারে। হজরত ইবরাহিম (আ.) ভাবলেন, ইনিই সেই নারী, যার ভালোবাসার বাঁধনে চিরকাল আটকে থাকা যায়। ইবরাহিম (আ.) সারাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সারা রাজি হন। ইবরাহিম (আ.) শর্ত দেন, সারা কখনোই যেন তাকে ছেড়ে না যান, সুখে-দুঃখে আজীবন তার সঙ্গে থাবেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪৩, ইফাবা) এরপর ইবরাহিম (আ.) সারাকে (আ.) নিয়ে অনেক পথ পাড়ি দেন। এক পর্যায়ে মিশরে পৌঁছান। সেই আমলে মিশরে যে রাজত্ব করত, সে ছিল অত্যাচারী দুরাচার। তার রাজ্যে যদি কোনো সুন্দরী রূপবতী প্রবেশ করত, সে যদি অবিবাহিত ও তার সঙ্গে পিতা বা ভাইয়ের সঙ্গে থাকত, তবে সে কিছুই করত না। আর যদি সে বিবাহিত ও তার সঙ্গে স্বামী থাকত, তবে সে সেই নারীর স্বামীকে হত্যা করে তাকে ধর্ষণ করত। হযরত ইবরাহিমকে (আ.) যখন ধরে সেই রাজার দরবারে হাজির করা হয়, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সাথের এই নারী কে? তিনি তখন বাঁচার জন্য বলেন, ইনি আমার বোন। (আদি পিতা আদমের সন্তান অর্থে) এরপর তিনি বিবি সারার (আ.) কাছে গিয়ে বলেন, এই দেশে আমি আর তুমি ছাড়া আর কোনো মুমিন নেই। এই লোকটি (মিশরের রাজা) আমাকে তোমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি তাকে বলেছি যে তুমি আমার বোন। তুমিও এই কথাই বোলো। (সহিহ বুখারি: ৩৩৫৮) সারাকে (আ.) যখন রাজার সামনে নিয়ে যাওয়া হলো, তাকে দেখে রাজার মনে কুকামনা জেগে উঠলো। নিজের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য রাজা সারাকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন। বন্দী হয়ে সারা (আ.) ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন, হে আল্লাহ, আমি যদি আপনার প্রতি এবং আপনার রাসুলের প্রতি ইমান এনে থাকি, আর আমার স্বামী ছাড়া অন্যদের কাছে নিজের সতীত্ব রক্ষা করে থাকি, তবে তুমি এই কাফেরকে আমার ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ দিয়ো না। (সহিহ বুখারি: ২২১৭) আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করেন। রাজা যখন পাপের ইচ্ছা নিয়ে সারার কাছে আসে, আচমকা সে মৃগীরোগীর মতো মাটিতে পড়ে যায়। তার মনে হচ্ছিল অদৃশ্য কোনো হাত তার গলা চেপে ধরেছে। সে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। সারা (আ.) তখন আল্লাহর দরবারে আর্জি জানালেন, ‘হে আল্লাহ, এই লোকটি যদি মারা যায়, তাহলে লোকজন বলবে, এই মহিলা একে হত্যা করেছে।’ কিছুক্ষণ ছটফট করে মিশরের রাজা এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়, তার হুঁশ ফিরে আসে। কিন্তু সে আবার সারার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে আবার ওই যন্ত্রণা ফিরে আসে। এভাবে তিনবার সে চেষ্টা চালিয়ে তিনবারই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তির মুখে পড়ে। রাজা তখন খাস পাহারাদারকে ডেকে বলে, তুমি তো আমার কাছে কোনো মানুষ আনো নাই, বরং একটা শয়তান এনেছো! (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৭৩৭) ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, রাজা এখানে ‘শয়তান’ বলে ‘জিন’ বুঝিয়েছেন। ইসলামপূর্ব আরবে সব ধরনের অতিপ্রাকৃত ঘটনাকেই ‘জিনের কাজ’ মনে করা হতো। (ফাতহুল বারি, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯৪, আল মাকতাবাতুস সালাফিয়্যাহ, মিশর) এই ঘটনার পর মিশরের রাজা সারার (আ.) খেদমতের জন্য তার মেয়ে হাজেরাকে (আ.) উপহার দেন এবং সারাকে মুক্ত করে দেন। মুক্তি পেয়ে সারা (আ.) ছুটে যান তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর কাছে। তখন ইবরাহিম (আ.) এই বিপদ থেকে বাঁচতে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছিলেন। তিনি সারাকে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করে জানতে চাইলেন, কী খবর? সারা বললেন, আল্লাহ কাফেরের সব ষড়যন্ত্র তার ওপরই ঘুরিয়ে দিয়েছেন, আর আমাকে একজন সেবিকা দান করেছেন। (সহিহ বুখারি: ৩৩৫৮, মুসনাদে আহমদ: ৯২৪১) ইবরাহিম (আ.) সারা ও হাজেরাকে নিয়ে মিশর ছেড়ে ফিলিস্তিনে চলে যান। ফিলিস্তিনের কানআন নামক অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সারা (আ.) বন্ধ্যা ছিলেন। হজরত ইবরাহিমের (আ.) বয়স যখন একশ ছুঁই ছুঁই, আর সারার (আ.) নব্বই, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে তার গর্ভধারণের সংবাদ দেন। তিনি খুবই আশ্চর্য হয়ে বলেন, আমি কী সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বৃদ্ধা এবং আমার এই স্বামীও বৃদ্ধ! (সুরা হুদ: ৭২) কিন্তু আল্লাহ চাইলে সবই হয়। ওই বয়সে সারার কোলজুড়ে একটি ফুটফুটে সন্তান হয়, যার নাম রাখা হয় ইসহাক। পরবর্তীতে তিনি একজন নবী হন, এবং তার বংশধরদের মধ্যে ইয়াকুব, ইউসুফ, মুসা, হারুন, দাউদ, সুলাইমান ও ঈসার (আ.) মতো মহান নবী-রাসুলদের জন্ম হয়। আহলে কিতাবের সূত্র অনুযায়ী বিবি সারা (আ.) ১২৭ বছর বেঁচেছিলেন, এরপর কানআনে তার ইন্তেকাল হয়। (বাইবেল, জেনেসিস ২৩:১-২) স্বামীর সুখ-দুঃখে আজীবন সাথে থেকে তিনি ‘ছেড়ে না যাওয়ার’ শর্ত রক্ষা করেছিলেন, বিয়ের সময় হযরত ইবরাহিম (আ.) যে শর্ত দিয়েছিলেন। ওএফএফ

Source: Jago News 24 Bangla