পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের সময়ে সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা

কিশোর বয়স নানা ধরনের পরিবর্তনে ভরা। এই সময়ে শরীর, মন ও অনুভূতি দ্রুত পরিণত হতে থাকে। কিশোর-কিশোরীরা একই সঙ্গে বুঝতে শেখে—তারা কে এবং ভবিষ্যতে কেমন মানুষ হতে চায়। নিজেদের আবিষ্কার করতে গিয়ে তাদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। আর নতুন কিছু চেষ্টা করার সঙ্গে কখনো কখনো ঝুঁকিও জড়িত থাকে।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের NIH-এর অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিরোধমূলক গবেষণার গবেষক ড. কেভিন হ্যাগার্টি বলেন, “কিশোর বয়সে সন্তান লালন-পালন একদিকে খুবই আনন্দদায়ক ও রোমাঞ্চকর হতে পারে, অন্যদিকে এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ একটি সময়ও।”

এর একটি কারণ হলো, কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক তখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকে। আবেগ এবং আনন্দদায়ক অনুভূতির প্রতি তাদের মস্তিষ্ক বিশেষভাবে সংবেদনশীল থাকে। অন্যদিকে আবেগের তাড়না নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলো তখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

হ্যাগার্টি ব্যাখ্যা করেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত আসক্ত হয়ে পড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অ্যালকোহল, মাদক ও তামাক ব্যবহারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ এবং বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে। উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও এই সময়ে বেশি হতে পারে।

কিশোর-কিশোরীরা কখনো অস্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে পারে এবং শারীরিক কার্যক্রম বা ব্যায়ামের প্রতি অবহেলা করতে পারে। তাদের অধিকাংশই প্রতি রাতে প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম পায় না। তবে বাবা-মায়ের কিছু কার্যকর কৌশল সন্তানকে স্বাস্থ্যকর এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব অরেগনের NIH-এর অর্থায়নে গবেষণা করা মনোবিজ্ঞানী ড. বেথ স্টর্মশাক বলেন, “সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা, তারা কার সঙ্গে মিশছে তা জানা ও খেয়াল রাখা এবং বাবা-মা হিসেবে তাদের জীবনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা—ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।”

স্টর্মশাক ও হ্যাগার্টি কিশোর-কিশোরীদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি বিভিন্ন অভিভাবকত্ব কর্মসূচি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের এবং অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট কৌশল সত্যিই কার্যকর হতে পারে।

ইতিবাচক ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলুন

সন্তানের সঙ্গে ইতিবাচক ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন সম্পর্ক থাকলে সন্তান আপনার পরামর্শ শোনার এবং পরিবারের নিয়ম মেনে চলার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

স্টর্মশাক বলেন, “ইতিবাচক অভিভাবকত্বের অর্থ হলো সন্তানের সঙ্গে এমন একটি ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করা যেখানে চিৎকার, সমালোচনা বা বারবার বকাঝকার পরিবর্তে প্রশংসা, সহযোগিতা, উৎসাহ ও পুরস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।”

তার মতে, কিশোর সন্তানের সঙ্গে আচরণে একটি বিষয় পরিবর্তন করতে চাইলে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে।

সন্তানের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর মাধ্যমে আরও ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন। সে কী ভাবছে এবং কী অনুভব করছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তার সমস্যা ও উদ্বেগের প্রতি আগ্রহ দেখান। এতে সে আপনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ও সংযুক্ত বোধ করবে।

সন্তান যখন নিজের কথা আপনার সঙ্গে ভাগ করে, তখন শান্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। মতের পার্থক্য হলেও তার মতামতকে সম্মান করুন। এতে পারস্পরিক বিশ্বাস তৈরি হয়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যা কীভাবে সমাধান করতে হয় তা শেখানোর সুযোগ তৈরি হয়। শুধু উপদেশ বা বক্তৃতা দেওয়ার পরিবর্তে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ আরও ভালো হতে পারে।

সন্তানের ইতিবাচক আচরণ লক্ষ্য করুন এবং তার প্রশংসা করুন। নতুন কিছু শেখার সুযোগ দিন। সে যখন ভালো কিছু করে, তখন তাকে জানান যে আপনি তার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করেছেন এবং মূল্যায়ন করছেন।

পরিবারের নিয়ম ও প্রত্যাশা নির্ধারণের আলোচনায় কিশোর সন্তানকেও যুক্ত করা ভালো। এতে খোলামেলা ও ইতিবাচক যোগাযোগ তৈরি হয় এবং পরিবারের নিয়মগুলো সবার কাছে পরিষ্কার থাকে।

সন্তানের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ বজায় রাখতে পারলে আপনি সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করতে পারবেন, ভালো আচরণকে উৎসাহিত করতে পারবেন এবং তার জীবনে কী ঘটছে সে সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে পারবেন।

যোগাযোগ বজায় রাখুন

সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বাবা-মায়ের সঙ্গে তার কাটানো সময় কমে আসে। এ কারণে বিশ্বাস ও ভালো যোগাযোগের সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সন্তানের জীবনে কী ঘটছে তা আপনি কতটা জানতে পারবেন, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করবে সে আপনার সঙ্গে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের কথা ভাগ করতে পারে তার ওপর।

হ্যাগার্টি বলেন, “কিশোর সন্তানের জীবনে কী ঘটছে তা এমনভাবে খেয়াল রাখুন, যাতে আপনাদের সম্পর্ক নষ্ট না হয়; বরং সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়।”

তার পরামর্শ হলো—সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন, প্রশ্ন করুন, তার বন্ধুদের চিনুন এবং সম্ভব হলে তাদের সঙ্গেও কথা বলুন।

এসব আলোচনা সব সময় আনুষ্ঠানিকভাবে মুখোমুখি বসে করতে হবে এমন নয়। হাঁটার সময়, কোথাও যাওয়ার পথে, গাড়িতে বসে কিংবা সন্তানকে কোথাও পৌঁছে দেওয়ার সময় স্বাভাবিক কথোপকথনের মধ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়। মূল বিষয় হলো সন্তানের জীবনে কী ঘটছে সে সম্পর্কে সচেতন থাকা।

NIH-এর জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. ব্রুস সিমন্স-মর্টনের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোরের বন্ধুদের মধ্যে অ্যালকোহল পান করার প্রবণতা বেশি, তাদের নিজেদেরও অ্যালকোহল ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি।

প্রকৃতপক্ষে, কিশোরদের অ্যালকোহল ব্যবহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো সমবয়সী বন্ধুদের প্রভাব বা Peer Influence

তিনি বলেন, “কিশোর-কিশোরীরা যত বড় হয়, তত বেশি সময় সমবয়সীদের সঙ্গে কাটায়। ধীরে ধীরে বাবা-মায়ের প্রভাব কিছুটা কমে এবং বন্ধুদের প্রভাব বাড়তে থাকে।”

তাই ভালো বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন গুণগুলো গুরুত্বপূর্ণ তা সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করুন। যেমন—সৎ হওয়া, অন্যকে সম্মান করা, পড়াশোনা ও স্কুলের কাজে আগ্রহী থাকা এবং বিপজ্জনক বা অস্বাস্থ্যকর আচরণ থেকে দূরে থাকা।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের প্রত্যাশা ও সহযোগিতা সন্তানের সিদ্ধান্তকে তরুণ বয়স পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে।

যেসব কিশোর-কিশোরীর বাবা-মা তাদের জীবনের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত থাকেন, তাদের মধ্যে অ্যালকোহল ও মাদক ব্যবহারের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং যৌন আচরণের ক্ষেত্রেও তারা তুলনামূলক নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

স্পষ্ট সীমা ও নিয়ম নির্ধারণ করুন

বাবা-মা আগে থেকেই পরিষ্কার সীমা, নিয়ম ও প্রত্যাশা নির্ধারণ করে এবং নিয়ম ভাঙলে ধারাবাহিকভাবে উপযুক্ত পরিণতি প্রয়োগ করে কিশোর সন্তানকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারেন।

সিমন্স-মর্টন বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এমনকি উচ্চবিদ্যালয় শেষ হওয়ার পরের বছরেও বাবা-মায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ থাকে।”

তার গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব তরুণের বাবা-মা অ্যালকোহলের অপব্যবহার না করার বিষয়ে সন্তানের কাছে দৃঢ় প্রত্যাশা প্রকাশ করেছিলেন, উচ্চবিদ্যালয় শেষ করার পর তাদের অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম ছিল।

তাই সন্তান ছোট থাকতেই অ্যালকোহল, মাদক, গাড়ি চালানো এবং যৌন আচরণ সম্পর্কে আপনার প্রত্যাশা ও মূল্যবোধ স্পষ্টভাবে জানাতে শুরু করুন।

তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রম ও ব্যায়ামে উৎসাহিত করুন। পুরো কিশোর বয়সজুড়েই আপনার প্রত্যাশা ও পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যান।

সন্তান নিয়ম মেনে চললে তার প্রশংসা করুন এবং উপযুক্ত পুরস্কার দিন। এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

নিয়ম ভাঙলে যুক্তিসংগত পরিণতি রাখুন

সন্তানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু সুযোগ-সুবিধাকে নিয়মের সঙ্গে যুক্ত করাও কার্যকর অভিভাবকত্বের অংশ হতে পারে। তবে কোন বিষয়টি কার্যকর হবে তা প্রতিটি কিশোরের ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার, ভিডিও গেম খেলা, পছন্দের শখ বা খেলাধুলায় সময় দেওয়া কিংবা গাড়ি চালানোর মতো কিছু সুযোগ-সুবিধা ভালো আচরণ উৎসাহিত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে শাস্তির উদ্দেশ্য যেন সন্তানকে অপমান করা বা ভয় দেখানো না হয়। বরং তাকে নিজের সিদ্ধান্তের ফলাফল বুঝতে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে শেখানোই হওয়া উচিত।

কিশোর বয়সে সন্তানের পাশে থাকুন

স্টর্মশাক বলেন, “কৈশোর এমন একটি সময় যখন একজন মানুষ বোঝার চেষ্টা করে—সে আসলে কে।”

বাবা-মা হিসেবে আপনি যে সব সময় সন্তানকে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করতে পারবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

তবে আপনার মূল্যবোধ, প্রত্যাশা এবং জীবনের অভিজ্ঞতা সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তার সিদ্ধান্তগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন।

কিশোর সন্তানকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে তার কথা শুনুন, তাকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে সঠিক দিকনির্দেশনা দিন।

বিশ্বাস, ভালোবাসা, খোলামেলা যোগাযোগ, স্পষ্ট সীমারেখা এবং নিয়মিত সহযোগিতা—এই বিষয়গুলো কিশোর সন্তানকে জীবনের চ্যালেঞ্জিং সময়ে আরও নিরাপদ ও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

Source: https://newsinhealth.nih.gov/2019/06/parenting-teens