ধরুন অন্যান্য দিনের মতোই আপনি অফিসের কাজে ব্যস্ত কিংবা ঘরের কোনো কাজ করছেন। কিংবা হতে পারে কোথাও যাচ্ছেন গাড়িতে বা বাসে করে। রৌদ্রজ্জ্বল একটি দিন, কোনো নতুন কিছু নয়। অন্যান্য দিনের মতোই একটি দিন। তবে যদি এমন হয়, দিনের বেলা হঠাৎ করেই আকাশের আলো ম্লান হয়ে গেল। সূর্যের চারপাশের উজ্জ্বলতা একে একে হারিয়ে যাচ্ছে, চারদিকে নেমে আসছে রাতের মতো অন্ধকার। আবার কয়েক মিনিট পর আবার আলো ফিরেও এলো। তাহলে আপনি কি করবেন। অনেকেই ভাবতে পারেন স্বপ্ন দেখছেন, চোখের ভুল কিংবা সিনেমায় দেখা কোনো মহাকাশ যান বা কোনো রহস্যময় ঘটনা ঘটছে হয়তো। এমনই এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবী। ২০২৭ সালের আগস্টে ঘটতে চলা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় কোনো কোনো অঞ্চল প্রায় ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড দিনের আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে। ২০২৭ সালের ২ আগস্ট ঘটবে এই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। মহাকাশবিষয়ক তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট স্পেস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২১১৪ সালের মধ্যে স্থলভাগ থেকে দৃশ্যমান পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে দীর্ঘ। ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি মহাকাশপ্রেমীদের কাছেও দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আরও পড়ুন আজ দেখা যাবে বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ কীভাবে তৈরি হবে দিনের বেলা রাতের অন্ধকার? সূর্যগ্রহণ আসলে মহাকাশে ঘটে যাওয়া একটি নিখুঁত অবস্থানগত ঘটনা। চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় কোনো এক মুহূর্তে সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চলে আসে। তখন চাঁদের ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে। চাঁদ যদি সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে, তখন তৈরি হয় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। এই সময় সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি পুরোপুরি আড়াল হয়ে যায়। পৃথিবীর যে সরু অঞ্চলের ওপর চাঁদের ঘন ছায়া পড়ে, সেখানে অবস্থানরত মানুষ সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢাকা অবস্থায় দেখতে পান। এই পর্যায়কেই বলা হয় ‘টোটালিটি’। ২০২৭ সালের গ্রহণের সময় টোটালিটির পথ ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। ফলে কয়েক মিনিটের জন্য দিনের আলো অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে চারপাশে সন্ধ্যা বা রাতের মতো পরিবেশ তৈরি হবে। কোথা থেকে দেখা যাবে? এই সূর্যগ্রহণের পূর্ণ পর্যায় দেখা যাবে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অঞ্চলে। মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসর, সুদান, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও সোমালিয়া এসব দেশের বিভিন্ন অংশ গ্রহণের পথের মধ্যে পড়বে। প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এমন অঞ্চলে অবস্থান করবেন, যেখান থেকে এই বিরল পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হবে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গ্রহণের পুরো সময় একই জায়গায় ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড অন্ধকার থাকবে বিষয়টি এমন নয়। সর্বোচ্চ টোটালিটি নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে দেখা যাবে; গ্রহণের পথের অন্য অংশে সময় কম হবে। আরও পড়ুন ৬০০ বছর আগে আবিষ্কৃত একযন্ত্র যেভাবে বিশ্বকে বদলে দিলো কিন্তু কেন এত দীর্ঘ হবে এই গ্রহণ? সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব সব সময় এক রকম হয় না। কোনো কোনো গ্রহণের পূর্ণগ্রাস পর্যায় কয়েক সেকেন্ডের মতো সংক্ষিপ্ত হতে পারে, আবার বিশেষ অবস্থায় তা কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর পেছনে রয়েছে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের পারস্পরিক দূরত্ব এবং তাদের কক্ষপথ। চাঁদ পৃথিবীকে পুরোপুরি গোলাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে না। ফলে কখনো চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় কিছুটা কাছে থাকে, আবার কখনো দূরে সরে যায়। একইভাবে পৃথিবীও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় সূর্য থেকে তার দূরত্বে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। চাঁদ যখন তুলনামূলকভাবে বড় দেখায় এবং সূর্যকে দীর্ঘ সময় ধরে ঢেকে রাখার মতো অবস্থান তৈরি হয়, তখন দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সম্ভাবনা বাড়ে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, সূর্যগ্রহণের মোট স্থায়িত্ব কয়েক সেকেন্ড থেকে প্রায় সাড়ে সাত মিনিট পর্যন্ত হতে পারে। তবে এত দীর্ঘ পূর্ণগ্রাস গ্রহণ খুব ঘন ঘন দেখা যায় না। তাই ২০২৭ সালের গ্রহণের ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের টোটালিটি বিশেষ আকর্ষণের কারণ। আরও পড়ুন রাজা-বাদশাহরা একসময় যেটা দিয়ে হাত মুছতেন, সেটাই এখন জনপ্রিয় খাবার! গ্রহণের সময় অন্ধকারে ডুবে যাবে পৃথিবী তবে পুরো পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে যাবে না। বরং চাঁদের ছায়া পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট সরু পথে পড়বে। সেই পথের মানুষই পূর্ণগ্রাসের অন্ধকার সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন। আশপাশের বিস্তৃত এলাকায় সূর্য আংশিক ঢাকা পড়বে এবং দিনের আলো কিছুটা কমে যাবে। পূর্ণগ্রাসের সময় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ ঢাকা পড়ে যাওয়ায় এর বাইরের বায়ুমণ্ডল, অর্থাৎ করোনা, খালি চোখে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র বা গ্রহও সাময়িকভাবে দেখা যেতে পারে। তাপমাত্রাতেও সামান্য পরিবর্তন অনুভূত হতে পারে এবং পরিবেশের আলো হঠাৎ বদলে যাওয়ায় প্রাণীদের আচরণেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে সূর্যগ্রহণ যতই আকর্ষণীয় হোক, এটি দেখার সময় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ সানগ্লাস দিয়ে সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়। সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশেষ সোলার ভিউয়ার বা সঠিক গ্রহণের চশমা ব্যবহার করতে হয়। পূর্ণগ্রাসের একেবারে ক্ষণিকের পর্যায় ছাড়া সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। সূত্র: সিএনএন, টাইমস অব ইন্ডিয়া কেএসকে

Source: Jago News 24 Bangla