বয়ঃসন্ধি বেড়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক অংশ। এটি একই সঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তনের সময়, যখন শিশুদের শরীর ধীরে ধীরে পরিণত হতে শুরু করে। হরমোনের মাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার কারণে বয়ঃসন্ধির শুরুর দিকে কিশোর-কিশোরীদের মেজাজ, কর্মশক্তি এবং ঘুমের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। নিজের চেহারা ও শারীরিক পরিবর্তন নিয়েও তারা সংকোচ বা অস্বস্তি অনুভব করতে পারে।
প্রত্যেকের শারীরিক পরিণতি নিজস্ব গতিতে ঘটে। সাধারণভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১৩ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়াকে স্বাভাবিক ধরা হয়। তবে কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এর আগে বা পরে শারীরিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব অরেগনের বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানী ড. জেনিফার ফাইফার বলেন, এই সময়ে বাবা-মা সন্তানের পাশে থেকে এবং তাকে মানসিকভাবে সহায়তা করে বয়ঃসন্ধির পরিবর্তনগুলো সহজে মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারেন।
ফাইফার বলেন, “বয়ঃসন্ধির সময় আমাদের শরীর ও মনের পরিবর্তন নিয়ে ইতিবাচকভাবে কথা বললে কিশোর-কিশোরীরা আশ্বস্ত হতে পারে যে এসব পরিবর্তন স্বাভাবিক। একই সঙ্গে এটি সন্তান ও অভিভাবকের মধ্যে খোলামেলা যোগাযোগের পথ তৈরি করতে পারে।”
যেসব শিশুর বয়ঃসন্ধি স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হয়, তাদের কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। কেন কারও কারও বয়ঃসন্ধি আগে শুরু হয় এবং কীভাবে তা প্রতিরোধ করা যেতে পারে—এ বিষয়ে NIH-এর গবেষকেরা কাজ করছেন।
বয়ঃসন্ধি কীভাবে শুরু হয়
বয়ঃসন্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয় মস্তিষ্ক থেকে। মস্তিষ্কের একটি ছোট অংশের নাম হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus)। এটি একটি হরমোন নিঃসরণ করে, যা হাইপোথ্যালামাসের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র অঙ্গ পিটুইটারি গ্রন্থিকে (Pituitary gland) আরও কিছু হরমোন নিঃসরণের নির্দেশ দেয়।
এই হরমোনগুলো মেয়েদের ডিম্বাশয়কে ইস্ট্রোজেন (Estrogen) এবং ছেলেদের অণ্ডকোষকে টেস্টোস্টেরন (Testosterone) নিঃসরণের সংকেত দেয়। এই পুরো প্রজনন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-গোনাডাল বা HPG Axis বলা হয়।
একই সময়ে কিডনির ওপর অবস্থিত ছোট অঙ্গ অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি (Adrenal glands) স্টেরয়েড হরমোন নিঃসরণ করে, যা শরীরে বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে।
সাধারণত সন্তান কখন বয়ঃসন্ধিতে প্রবেশ করছে তা বাবা-মা কিছু লক্ষণ দেখে বুঝতে পারেন। ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই যৌনাঙ্গের আশপাশে এবং বগলে লোম গজাতে শুরু করে। ঘাম বেশি হতে পারে, যার ফলে শরীরে দুর্গন্ধ ও ব্রণ দেখা দিতে পারে।
মেয়েদের স্তনের বিকাশ শুরু হয়। মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক বছর আগেও এই পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
ছেলেদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গের বৃদ্ধি শুরু হয় এবং অণ্ডকোষ ও পুরুষাঙ্গ আকারে বড় হতে থাকে। রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ (Wet Dream) শুরু হতে পারে, অর্থাৎ ঘুমন্ত অবস্থায় বীর্যপাত হতে পারে। একই সঙ্গে পেশির পরিমাণ বাড়ে, কাঁধ চওড়া হয় এবং কণ্ঠস্বর ভারী ও গভীর হতে শুরু করে।
দ্রুত উচ্চতা বৃদ্ধি বা Growth Spurt বয়ঃসন্ধির একটি স্বাভাবিক অংশ। মেয়েরা সাধারণত কিশোর বয়সের প্রথম দিকেই প্রায় পূর্ণ উচ্চতায় পৌঁছে যায়। ছেলেদের ক্ষেত্রে এটি সাধারণত আরও কয়েক বছর পরে ঘটে।
বয়ঃসন্ধির সময় মস্তিষ্কেরও দ্রুত বিকাশ ঘটে। সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী মস্তিষ্কের অংশগুলোর পরিবর্তনের কারণে কিশোর-কিশোরীরা বন্ধু ও সমবয়সীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করতে পারে।
বয়ঃসন্ধির সময় কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের সম্পর্কে কীভাবে চিন্তা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ফাইফার।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে মেয়েরা দেখতে পায় যে তাদের শরীর পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তারা বুঝতে পারে অন্যরাও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করছে। এটি নিজেদের সম্পর্কে তাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে।”
ফাইফার বয়ঃসন্ধি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে তা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি দেখেছেন, কিশোরী মেয়েদের মধ্যে বিষণ্নতার কিছু উপসর্গ বাড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কম আনন্দ অনুভব করা, বেশি একাকিত্ব বোধ করা, সহজে বিরক্ত হওয়া, খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া এবং সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার লক্ষণের মধ্যে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার আগ্রহ বা শক্তি কমে যাওয়ার কারণেও এমনটি ঘটতে পারে।
বয়ঃসন্ধি শুরু হওয়ার সময়
কিছু শিশুর বয়ঃসন্ধি অন্যদের তুলনায় আগে শুরু হয়। একে আগাম বা অকাল বয়ঃসন্ধি (Early/Precocious Puberty) বলা হয়।
মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ বছর বয়সের আগেই স্তনের বিকাশ শুরু হওয়া অথবা ১০ বছর বয়সের আগে মাসিক শুরু হওয়া আগাম বয়ঃসন্ধির লক্ষণ হতে পারে।
ছেলেদের ক্ষেত্রে ৯ বছর বয়সের আগেই যৌনাঙ্গের বৃদ্ধি শুরু হলে সেটিও আগাম বয়ঃসন্ধির লক্ষণ হতে পারে।
আগাম বয়ঃসন্ধি পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেসব মেয়ের বয়ঃসন্ধি খুব তাড়াতাড়ি শুরু হয়, তাদের বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। পরবর্তী জীবনে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ছেলেদেরও আগাম বয়ঃসন্ধি শুরু হলে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ছেলেদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আগাম বয়ঃসন্ধির প্রভাব সম্পূর্ণভাবে বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যেসব শিশুর বয়ঃসন্ধি স্বাভাবিকের তুলনায় আগে শুরু এবং শেষ হয়, তারা তাদের সম্ভাব্য পূর্ণ উচ্চতায় নাও পৌঁছাতে পারে।
আগাম বয়ঃসন্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলো বিবেচনা করে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে, চিকিৎসক স্বাভাবিক বয়স পর্যন্ত যৌন হরমোন নিঃসরণ সাময়িকভাবে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন।
কোন বিষয়গুলো বয়ঃসন্ধিকে প্রভাবিত করে
বয়ঃসন্ধি কখন শুরু হবে তা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পরিবেশগত প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ।
NIH-এর অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট কিছু জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন (Mutation) শনাক্ত করছেন, যা আগাম বয়ঃসন্ধি শুরু করতে পারে।
MKRN3 জিনের মিউটেশন আগাম বয়ঃসন্ধির পরিচিত জিনগত কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ বলে বিবেচিত হয়। এই মিউটেশন একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মধ্যে থাকতে পারে।
MKRN3 জিন শরীরে MKRN3 প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা দেয়। এই প্রোটিন বয়ঃসন্ধি কখন শুরু হবে তা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
স্বাভাবিক অবস্থায় MKRN3 প্রোটিন উপযুক্ত বয়স না আসা পর্যন্ত বয়ঃসন্ধির প্রক্রিয়া সক্রিয় হওয়া থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু জিনটিতে মিউটেশন হলে প্রোটিনটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে সেই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায় এবং বয়ঃসন্ধি স্বাভাবিকের তুলনায় আগে শুরু হতে পারে।
ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন্স হসপিটালের হরমোনজনিত রোগ বিশেষজ্ঞ ড. উরসুলা কাইজার বলেন, “MKRN3 প্রোটিন কীভাবে কাজ করে তা আমরা বোঝার চেষ্টা করছি, যাতে আগাম বয়ঃসন্ধি আরও ভালোভাবে প্রতিরোধ করা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “MKRN3 মিউটেশনের জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে যদি আগাম বয়ঃসন্ধির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়, তাহলে আরও আগে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হতে পারে।”
পরিবেশগত কারণও বয়ঃসন্ধির সময়কে প্রভাবিত করতে পারে।
শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের হরমোন নিয়ে কাজ করা NIH বিশেষজ্ঞ ড. নাটালি শ বলেন, “মানসিক চাপের ধরন, তীব্রতা এবং কখন সেই চাপ তৈরি হচ্ছে—এসবের ওপর নির্ভর করে মানসিক চাপ বয়ঃসন্ধিকে ত্বরান্বিত অথবা বিলম্বিত করতে পারে।”
শৈশবে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতাও আগাম বয়ঃসন্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি হরমোনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা বয়ঃসন্ধির প্রক্রিয়াকে আগে শুরু হওয়ার জন্য প্রভাবিত করতে পারে।
কিছু রাসায়নিক পদার্থ শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে আগাম বয়ঃসন্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ড. শ এবং অন্যান্য গবেষকেরা হাজার হাজার রাসায়নিক পদার্থ পরীক্ষা করে দেখেছেন কোনগুলো হরমোনের কার্যক্রম সক্রিয় করতে পারে। তারা দেখতে পান, মাস্ক অ্যামব্রেট (Musk Ambrette) নামের একটি সুগন্ধি উপাদান জেব্রাফিশের ওপর লক্ষণীয় প্রভাব ফেলেছে। মাস্ক অ্যামব্রেট সুগন্ধি, লোশন, সাবান এবং ডিটারজেন্টে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ড. শ বলেন, “আমাদের গবেষণার ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে এটি এমন একটি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে যে, নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের সংস্পর্শ শিশুদের প্রজননব্যবস্থার হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী অক্ষকে স্বাভাবিক সময়ের আগেই সক্রিয় করতে পারে।”
বাবা-মায়ের করণীয়
গবেষকেরা আগাম বয়ঃসন্ধি শনাক্ত এবং প্রতিরোধের আরও কার্যকর উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আপনার যদি মনে হয় যে আপনার সন্তানের বয়ঃসন্ধির লক্ষণ স্বাভাবিক বয়সের তুলনায় অনেক আগে দেখা দিচ্ছে, তাহলে সম্ভাব্য কারণ এবং করণীয় সম্পর্কে শিশুর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
বয়ঃসন্ধি কিশোর-কিশোরী এবং তাদের বাবা-মা—উভয়ের জন্যই একদিকে রোমাঞ্চকর, অন্যদিকে অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং একটি সময়।
এই সময়ে বাবা-মা সন্তানের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে সাহায্য করতে পারেন। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার প্রশ্নের বয়স উপযোগী ও সঠিক উত্তর দেওয়া, পরিবর্তনগুলো নিয়ে লজ্জা বা ভয় তৈরি না করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া—এসবই সন্তানকে বয়ঃসন্ধির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে।
Source:https://newsinhealth.nih.gov/2026/08/navigating-puberty

